জেন্ডার বাজেট কাঠামোয় নারী উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ বাড়লেও প্রান্তিক নারীরা এখনো উপেক্ষিত রয়ে গেছেন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নারী উন্নয়নের জন্য ৪ লাখ ৫৪ হাজার ২১১ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে, যা ৪৪টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগে বাস্তবায়নের লক্ষ্য রয়েছে। তবে এ বাজেট প্রান্তিক, দরিদ্র, আদিবাসী, প্রতিবন্ধী, একক ও তৃতীয় লিঙ্গের নারীদের জীবনকে স্পর্শ করতে পারেনি। বাজেটের একটি বড় অংশ প্রকল্পভিত্তিক, কেন্দ্রিক ও একমুখী হওয়ায় গ্রামীণ কিশোরী, পাহাড়ের মা ও শহরের যৌন নির্যাতনের শিকার নারীরা এতে অন্তর্ভুক্ত হন না। ফলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন ও চ্যালেঞ্জ বাজেট কাঠামোয় প্রতিফলিত না হওয়ায় উন্নয়ন কার্যক্রম একমুখী থেকে যাচ্ছে।
‘পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষায় সুষম অর্থায়ন ও ন্যায্যতা’ শিরোনামে ডেমোক্রেটিক বাজেট মুভমেন্ট (ডিবিএম) আয়োজিত ‘জন-বাজেট সংসদ ২০২৫’ শীর্ষক আলোচনার দ্বিতীয় অধিবেশনের গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য। দ্বিতীয় অধিবেশনের বিষয় ছিল ‘জাতীয় বাজেট: জেন্ডার ন্যায্যতা ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তি’।
গবেষণা প্রতিবেদনে জানা যায়, অধিকাংশ মন্ত্রণালয় বা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান লিঙ্গ, বয়স ও সক্ষমতাভিত্তিক তথ্য সংরক্ষণ করে না। এতে প্রকল্প বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন কঠিন হয় এবং বরাদ্দের সুনির্দিষ্টতা থাকে না। একই সঙ্গে স্থানীয় বাজেট সভায় নারীর অংশগ্রহণও কম দেখা যায়। ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশন ও সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে জেলাভিত্তিক নারীদের হতাশাজনক চিত্র উঠে এসেছে।
ঢাকা, সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া, গাইবান্ধা, বান্দরবানসহ ৯টি জেলার নারীদের মাতৃত্বকালীন ভাতা, শিশুস্বাস্থ্য, নিরাপদ আশ্রয়, পুনর্বাসন ও সহিংসতা থেকে সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে বাজেট ঘাটতি রয়েছে। সাতক্ষীরায় লবণাক্ততার কারণে নারী স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়লেও স্বাস্থ্য বাজেটে এর প্রতিফলন নেই। কুষ্টিয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় নারীর প্রশিক্ষণ বা ক্ষুদ্র ঋণের ব্যবস্থা অপ্রতুল। বান্দরবানের পাহাড়ি নারীরা অভিযোগ করেছেন, পর্যটন উন্নয়নের বাজেটে তাদের অংশগ্রহণ নেই, অথচ তারাই জমি হারাচ্ছেন। এছাড়া জাতীয় বাজেটে নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলা হলেও কৃষি, প্রযুক্তি বা অবকাঠামো খাতে নারীর কার্যকর অংশগ্রহণ এখনো নিশ্চিত হয়নি। বাজেটের ভাষা দুর্বোধ্য হওয়ায় প্রান্তিক নারীদের জন্য তা অপ্রাসঙ্গিক।
প্রতিবেদনে লিঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণযোগ্য তথ্যের অভাব, স্থানীয় পর্যায়ে নারীর সীমিত অংশগ্রহণ, বাজেট বাস্তবায়নে মনিটরিংয়ের অভাব এবং বাজেটের ভাষা ও কাঠামো সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থাকার মতো প্রতিবন্ধকতাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে।
এসব সমস্যা সমাধানে বাজেটকে নারীবান্ধব করতে কিছু সুপারিশ করা হয়েছে। নারীদের বাস্তব চাহিদার ভিত্তিতে বিশেষ বাজেট লাইন চালু করা, ইউনিয়ন ও পৌরসভায় নারীবান্ধব বাজেট সভা ও পরিকল্পনা নিশ্চিত করা এবং তথ্যভিত্তিক জেন্ডার-ডেটা তৈরি করে বাজেট মনিটরিংয়ে স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও নারী সংগঠনের অংশগ্রহণ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনে জেন্ডার বাজেটকে কেবল হিসাবের খাতা হিসেবে না দেখে নারীর জীবনের প্রয়োজন ও সম্ভাবনা হিসেবে দেখতে বলা হয়েছে। নারী কেবল সুবিধাভোগী নন, বাজেট পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও পরিবর্তনের চালিকাশক্তি—এ দৃষ্টিভঙ্গিই আগামী দিনের বাজেট রূপান্তরের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত।
জেন্ডার বাজেট প্রণয়নে প্রান্তিক নারীসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শরমিন্দ নীলোর্মি বলেন, ‘জেন্ডার বাজেটের কার্যকারিতার প্রধান অন্তরায় হলো ডেটার অভাব। প্রান্তিক নারী ও অন্যান্য সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর সুস্পষ্ট ডেটা সংগ্রহ করতে হবে। এ ডেটার মধ্যে তাদের আর্থসামাজিক অবস্থা, প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। সংখ্যাভিত্তিক বাজেট প্রণয়নের পরিবর্তে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের কর্মসূচিভিত্তিক বাজেট প্রণয়ন করা উচিত। কোন কর্মসূচিতে কত বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে এবং সেই কর্মসূচির মাধ্যমে প্রান্তিক নারীসহ অন্যান্য জনগোষ্ঠী কীভাবে উপকৃত হবে, তার সুস্পষ্ট বিবরণ বাজেটে উল্লেখ করতে হবে। প্রথম থেকে আমরা রিকারেন্ট ক্যাপিটাল, জেন্ডার অ্যান্ড পোভার্টি মডেল (আরসিজিপি) মডেল ব্যবহার করতাম। এ মডেলের মাধ্যমে প্রত্যেক মন্ত্রণালয় তার সামনের অর্থবছরে বাজেটে যে যে কর্মসূচি হাতে নেবে বা প্রয়োজন তার সঙ্গে একটা বর্ণনা দেয়া যে কীভাবে নারীদের জন্য বাজেট বণ্টন হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘চলতি অর্থবছরে মন্ত্রণালয় নতুন কাঠামোগত পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। তারা বলছে ফাইনান্সিয়াল ট্র্যাকিংয়ের মধ্যে আনা যাবে। ঠিকঠাকমতো ব্যবহার করা হচ্ছে কিনা বোঝা যাবে। আদতে আপনি কী অঙ্গীকার করেছিলেন আর কী করছেন সেটার কিছু বোঝা যাবে না। এ ট্র্যাকিংয়ের ফলাফল দেখেই আমরা বুঝতে পারব এটা কাজ করছে কিনা। এটা এখনই বলা সম্ভব না। কোন কর্মসূচিতে কত টাকা খরচ হচ্ছে এবং তার ফলাফল কী, এসব তথ্য জনগণের কাছে সহজলভ্য করতে হবে। পাবলিক ডোমেইনে তথ্য প্রকাশের অভাব দূর করতে হবে।’